Home / জনসচেতনতা / গর্ভাবস্থায় রক্তস্বল্পতা বাড়াচ্ছে কৃমি

গর্ভাবস্থায় রক্তস্বল্পতা বাড়াচ্ছে কৃমি

image_202082.11_81416

পাঁচ দশক আগে অ্যানিমিয়া তাড়ানোর দেশজোড়া অভিযানে নেমেছিলেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। তখন দেখা গিয়েছিল, দেশের অর্ধেক নারীই গর্ভাবস্থায় ভয়াবহ রক্তস্বল্পতার শিকার ৷ লাগামছাড়া প্রসূতিমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর নেপথ্যে সেটাই ছিল একনম্বর কারণ৷ ৫৪ বছর পর দেখা গেল, অশ্বডিম্ব প্রসব করেছে সেই কেন্দ্রীয় কর্মসূচি৷ সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, গর্ভাবস্থায় দেশের ৫৯ শতাংশ মহিলাই প্রবল রক্ত স্বল্পতায় ভুগছেন৷এ রাজ্যও ব্যতিক্রম নয়।
ব্যর্থতার ময়নাতদন্ত করতে গিয়ে চমকে উঠেছেন বিশেষজ্ঞরা৷পরিকল্পনা রূপায়ণে যেমন দেদার ত্রুটি মিলেছে, তেমনই মিলেছে অন্য এক সংক্রমণের হদিস, যার জেরে অজান্তেই বছরে পর বছর জোর ধাক্কা খেয়েছে রক্তস্বল্পতা দূরীকরণের এই সরকারি প্রকল্প৷ একাধিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, কৃমিতেই শরীর থেকে শুষে নিচ্ছে জরুরি আয়রন৷ ফলে আয়রন বড়ি খেলেও তা কাজে লাগছে না তেমন, দূর করা যাচ্ছে না অ্যানিমিয়া৷ আর এর জেরেই তখনকার মতো এখনও বাগে আনা যাচ্ছে না প্রসূতি কিংবা শিশুর অকালমৃত্যু৷ প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি প্রসূতিই এই সমস্যার শিকার৷ এবার তাই প্রসূতিকালীন চিকিৎসার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে কৃমি মারার ওষুধকে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে অ্যান্টিন্যাটাল চেক-আপ প্রোটোকলে৷
রাজ্যের স্বাস্থ্য অধিকর্তা বিশ্বরঞ্জন শতপথী বলেন, ‘গর্ভাবস্থায় যাঁরা প্রবল রক্তস্বল্পতায় ভোগেন, তাঁদের ৪১ শতাংশ মহিলার ক্ষেত্রেই শরীরে মিলেছে কৃমির অস্তিত্ব৷ মূলত তা হুক-ওয়ার্ম৷’ তিনি জানান, শরীরে আয়রন শোষিত হয় যে অঙ্গের মাধ্যমে, সেই অন্ত্রতেই কৃমি বাসা বেঁধে থাকে আর আয়রন বড়ি কিংবা অন্যান্য খাবারদাবার থেকে আয়রন শুষে নিয়ে নিজের পুষ্টির ব্যবস্থা করে৷ নিট ফল, আয়রন সমৃদ্ধ খাবার কিংবা আয়রন বড়ি খেয়েও লাভ হয় না৷ ‘এবার তাই গর্ভাবস্থার তিন মাসের মাথায় সব প্রসূতিকে কৃমিনাশক অ্যালবেন্ডাজোল ট্যাবলেট দেওয়ার নিদান দিয়ে নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে সরকারি চিকিৎসকদের জন্য,’ মন্তব্য স্বাস্থ্য কর্মকর্তার৷
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, শুধু হুক-ওয়ার্ম নয়, গর্ভাবস্থায় রক্ত স্বল্পতার নেপথ্যে রয়েছে রাউন্ড-ওয়ার্ম, হুইপ-ওয়ার্মের মতো কৃমিও৷ এবং এই সংক্রমণ তৃতীয় বিশ্বের আর্থসামাজিক পটভূমিকায় অপুষ্টির অন্যতম প্রধান কারণ৷ তা হলে শুধুমাত্র প্রসূতিকালীন চিকিৎসায় কেন জোর দেওয়া হচ্ছে? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক আধিকারিকের যুক্তি, ‘গর্ভাবস্থায় রক্তস্বল্পতা সবচেয়ে বিপজ্জনক৷ কারণ তা মা ও শিশুর জন্য প্রাণঘাতী৷ যদি প্রাণে বেঁচেও যায়, তা হলেও সেই অপুষ্টি নবজাতকের গোটা জীবন রুগ্ণ করে দিতে পারে৷ তাই শুধু গর্ভাবস্থাতেই নয়, শিশুকে স্তন্যপান করানোর সময়েও আয়রন অপরিহার্য৷’ অ্যালবেন্ডাজোল ট্যাবলেটের তেমন কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া না-থাকায় এবং নিশ্চিত ভাবে কৃমি মারতে সক্ষম হওয়ায়, প্রথম বার খাওয়ার ছ’ মাস পর ফের ওষুধটি খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি৷
অর্ধশতকের রক্তাল্পতা দূরীকরণ অভিযানের মুখ থুবড়ে পড়ার নেপথ্যে অবশ্য কৃমি ছাড়াও আরও একগুচ্ছ খুঁত দেখতে পাচ্ছেন প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞরা৷ তাঁদের সর্বভারতীয় সংগঠন ফেডারেশন অফ অবস্ট্রেটিক্স অ্যান্ড গায়নেকোলজিক্যাল সোসাইটিজ অফ ইন্ডিয়া (ফগসি)-র সহ-সভাপতি আশিস মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘পুরোনো দিনের আয়রন বড়িতে যে যৌগ ব্যবহার করা হত তাতে পেটের সমস্যার মতো নানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যেত৷ ফলে তার গ্রহণযোগ্যতা কম৷ অথচ আয়রন বড়িতে অপেক্ষাকৃত সহনীয় যৌগের ব্যবহার দীর্ঘ দিন আগেই চালু হয়ে গিয়েছে৷ সেই বড়িকে কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত না-করাটা মূর্খামি হয়েছে৷ আয়রন ইঞ্জেকশনের ব্যবহার সম্পর্কেও সচেতনতার অভাব রয়ে গিয়েছে চিকিত্‍সক মহলের একাংশে৷’
তবে ফগসি-র সভাপতি প্রকাশ ত্রিবেদী জানান, তাঁদের পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শ খোলা মনেই সম্প্রতি গ্রহণ করেছে পশ্চিমবঙ্গসহ বেশ কিছু রাজ্য৷

সূত্র: এই সময়
আইএস

ফেসবুক আইডি থেকে মন্তব্য করতে পারেন

টি মন্তব্য